চীনের ছদ্মবেশী ড্রোন: পাখির মতো দেখায়, যুদ্ধের জন্য তৈরি

পাখির ছদ্মবেশে গুপ্তচর: চীনের ভয়ংকর ‘বার্ড ড্রোন’

আকাশে উড়ছে একদল পাখির মতো কিছু! প্রথম দেখায় মনে হবে মাছরাঙা বা কাকের ঝাঁক। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়—এগুলো আসলে পাখি নয়, যন্ত্র। শব্দহীনভাবে ডানা মেলছে, নিখুঁত ছন্দে উড়ছে, অথচ কোনো কিচিরমিচির নেই—এগুলো আসলে ‘বার্ড ড্রোন’।

চীনে তৈরি এ ড্রোনগুলো দেখতে অবিকল পাখির মতো। গঠন, নড়াচড়া, এমনকি ডানা ঝাপটানোর ধরন—সবই যেন জীবন্ত পাখির হুবহু অনুকরণ। এগুলোর মধ্যে আছে ৯০ গ্রাম ওজনের ম্যাগপাই থেকে শুরু করে বিশালাকৃতির ঈগল ড্রোন, যা হামলার জন্য সশস্ত্রও হতে পারে।

ড্রোন, কিন্তু একেবারে পাখির ছদ্মবেশে

এই ড্রোনগুলো তৈরি করা হয় বিভিন্ন পাখির আদলে—ম্যাগপাই, গাংচিল, বাজপাখি বা ঈগলের মতো। শহরাঞ্চলে ছোট আকৃতির পাখি-ড্রোন, আর প্রাকৃতিক এলাকায় বড় পাখির মতো দেখতে ড্রোন ব্যবহৃত হয়। ডানায় বিশেষ প্রযুক্তির ব্যবহারে শব্দ একেবারেই কম, এমনকি রাডারেও ধরা পড়ে না। তৈরি হয় হালকা, নমনীয় অথচ মজবুত রাবারজাতীয় পদার্থ দিয়ে। ছোট ম্যাগপাই ড্রোনে থাকে ক্যামেরা, আর ঈগল-আকৃতির ড্রোন বহন করতে পারে বোমাও।

নিরাপত্তা থেকে হামলা—সবই সম্ভব পাখি ড্রোন দিয়ে

শুরুর দিকে এ ড্রোনগুলো শুধু নজরদারির কাজে ব্যবহার হতো। কিন্তু এখন ছোট ম্যাগপাই ড্রোন গোপনে শহরে তথ্য সংগ্রহ করে আর বড় ঈগল ড্রোন টানা ৪০ মিনিট উড়ে হামলা চালাতে পারে। এগুলোর কিছু কিছু মডেলে ছোট মিসাইলও যুক্ত করা যায়। এমনকি আছে হামিংবার্ড নামের ড্রোন—১০ কেজি ওজন, ৭ কেজি বিস্ফোরক বহন করতে সক্ষম, যা একজন সৈনিক নিজেই বহন ও পরিচালনা করতে পারে।

যুদ্ধের কৌশলে নতুন অধ্যায়

বার্ড ড্রোনের ব্যবহার যুদ্ধের ধরনই পাল্টে দিচ্ছে। এখন শুধু যুদ্ধবিমান নয়, ড্রোন দিয়ে একযোগে নজরদারি ও আক্রমণ চালানো হচ্ছে। একাধিক ড্রোন একসঙ্গে উড়ে শহরের গলিপথ পর্যবেক্ষণ করে এবং শত্রুপক্ষ বুঝে ওঠার আগেই কার্যকরী আঘাত হানে।

ড্রোনগুলো আধা-স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে, এমনকি জিপিএস সিগনাল না থাকলেও চলতে পারে। তাই কঠিন পরিস্থিতিতেও এগুলোর কার্যকারিতা অটুট থাকে।

প্রতিরোধ ও নৈতিকতার দ্বিধা

চীন ড্রোন তৈরির পাশাপাশি এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছে। ‘কে-২৫’ নামের একটি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থা রয়েছে, যা ২০০ মিটার দূর থেকে ছোট ড্রোন শনাক্ত করে গুলি ছুঁড়তে পারে এবং এতে ৯০% সফলতা পাওয়া গেছে।

তবে পাখির মতো দেখতে এসব ড্রোন শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। রাডার, ক্যামেরা, তাপমাত্রা-নির্ভর ডিভাইস—সবই বিভ্রান্ত হতে পারে। এতে তৈরি হয় নজরদারি ও গোপন তথ্য সংগ্রহ নিয়ে নিরাপত্তা ও নৈতিকতার প্রশ্ন।

মানুষ জানতেই পারে না যে তাদের ঘিরে ঘুরে বেড়াচ্ছে আসলে একটি গুপ্তচর ড্রোন। ফলে সমাজে মানসিক উদ্বেগ বাড়তে পারে। বিশেষ করে দমন-পীড়নের শিকার দেশগুলোতে এই প্রযুক্তি ভয়ের নতুন অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।

একটি নতুন যুগের সূচনা

এটা শুধু প্রযুক্তির অগ্রগতি নয়, বরং যুদ্ধ, নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং মানবাধিকারের জটিল ছায়াপাত তৈরি করছে। ড্রোনগুলো যতটা উন্নত, ততটাই বিপজ্জনক—বিশেষ করে যদি তা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছড়িয়ে পড়ে কিংবা ভুল হাতে পড়ে।

চীনের পাখি-আকৃতির ড্রোন শুধু আকাশে নতুন প্রযুক্তি নয়, বরং যুদ্ধের ধরনে, নৈতিকতাবোধে ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় এক নতুন প্রশ্নচিহ্ন। হয়তো একদিন আকাশে উড়ে যাওয়া একটি সাধারণ পাখি হঠাৎই হয়ে উঠবে এক মারাত্মক অস্ত্র—আর আমরা টেরও পাব না।

সূত্রঃ কালবেলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *