কলকাতায় ধর্মীয় বিদ্বেষের শিকার মুসলিম নারী উপাধ্যক্ষ, ছাড়লেন পদ

কলকাতায় মুসলিম নারী উপাধ্যক্ষকে ঘিরে বিতর্ক, ২৩ ঘণ্টা পর পদত্যাগ

কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ ল’ কলেজের উপাধ্যক্ষ ড. মহম্মদী তরন্নুমকে প্রায় ২৩ ঘণ্টা আটকে রেখে মানসিক ও শারীরিকভাবে হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও বার কাউন্সিলের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের ৭৫ শতাংশ উপস্থিতি নিশ্চিত করার অবস্থান নেওয়ার পর থেকেই অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) বিক্ষোভের মুখে পড়েন তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এরপর তার কক্ষে গঙ্গাজল ছিটিয়ে ও ধূপ জ্বালিয়ে ‘শুদ্ধিকরণ’ করা হয়। সমালোচকদের মতে, এ ঘটনা ধর্মীয় বিদ্বেষের গুরুতর অভিযোগ সামনে এনেছে।

কলেজের সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসা ড. তরন্নুমের পদত্যাগের ঘটনায় রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিও সামনে এসেছে। তাদের দাবি, পশ্চিমবঙ্গের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপর্যায়ে সংখ্যালঘু শিক্ষকদের উপস্থিতি এমনিতেই সীমিত।

ঘটনার সূত্রপাত দ্বিতীয়, চতুর্থ, ষষ্ঠ ও অষ্টম সেমিস্টারের পরীক্ষার ফর্ম পূরণের শেষ দিনে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে। তবে উপাধ্যক্ষের ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, এর পেছনে আরও কিছু রাজনৈতিক কারণ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, অতীতে তৃণমূল কংগ্রেস নেতা দেবাশিস ব্যানার্জির বিরুদ্ধে কলেজের কাজে হস্তক্ষেপের অভিযোগ থাকলেও বর্তমানে বিজেপি নেতা সজল ঘোষকে ঘিরে একই ধরনের অভিযোগ উঠছে।

এর আগে কলেজের একটি তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে তলোয়ার ও বিপুল পরিমাণ টাকা উদ্ধারের ঘটনাও আলোচনায় আসে। ওই সময় সজল ঘোষ উপাধ্যক্ষকে একটি নথিতে স্বাক্ষর করতে চাপ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি এতে রাজি না হওয়ায় হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।

এদিকে বিক্ষোভকারীদের ঘেরাওয়ের সময় ড. তরন্নুমকে একটি অন্ধকার কক্ষে আটকে রেখে আলো ও পাখা বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তার দাবি অনুযায়ী, প্রায় ২৩ ঘণ্টা তাকে খাবার ও পানি ছাড়াই সেখানে থাকতে হয়েছে।

পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের জন্য তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, উচ্চশিক্ষামন্ত্রী এবং কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও বিজেপি বিধায়ক কৌস্তভ বাগচীর কাছে সহায়তা চেয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তবে তার অভিযোগ, ওই সময় প্রত্যাশিত সহযোগিতা তিনি পাননি।

কৌস্তভ বাগচী উপস্থিতির নিয়মের যৌক্তিকতা স্বীকার করলেও উপাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তোলেন বলে জানা গেছে।

পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও পরিস্থিতির চাপে পুলিশি নিরাপত্তায় কলেজ থেকে বেরিয়ে যেতে হয় ড. তরন্নুমকে। এ সময় তিনি দাবি করেন, নিজের ইচ্ছায় তিনি পদত্যাগ করেননি; তাকে পদ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।

ঘটনাটিকে ঘিরে এখন ধর্মীয় বিদ্বেষ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব এবং শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *