হুথি মোকাবিলায় সৌদিকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরান-সমর্থিত হুথিদের মোকাবিলায় সৌদি আরবের সামরিক তৎপরতা বাড়ছে। এরই মধ্যে সৌদি বাহিনীকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, হুথিদের অবস্থান শনাক্ত এবং সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা আরও জোরদার হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, সৌদি আরবে বর্তমানে ১০০-এর বেশি মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা দায়িত্ব পালন করছেন। হুথিদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে সৌদি বাহিনীকে লক্ষ্য নির্ধারণে সহযোগিতা করাই তাদের প্রধান দায়িত্ব।

সম্প্রতি গঠিত একটি যৌথ বাহিনী কমান্ডের অধীনে এসব মার্কিন সামরিক সদস্য কাজ করছেন। কয়েক সপ্তাহ আগে সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সমন্বয় বাড়াতে এই কমান্ড গঠন করা হয়।

যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য সৌদি আরবকে একটি উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে সহযোগিতা করছে ওয়াশিংটন। প্রযুক্তিটি পেন্টাগনের ‘ম্যাভেন’ ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভৌগোলিক তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে হুথিদের অবস্থান চিহ্নিত এবং হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্য নির্ধারণেও সৌদি বাহিনীকে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

তবে মার্কিন সহায়তার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করলেও সৌদি আরবের হয়ে সরাসরি হামলায় অংশ নিচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি সৌদি যুদ্ধবিমানকে জ্বালানি সরবরাহ বা অন্য কোনো সরাসরি সামরিক সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে না।

হুথিদের অগ্রযাত্রায় বাড়ছে উদ্বেগ

সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর বর্তমান পরিস্থিতিকে সবচেয়ে বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার লোহিত সাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হুথিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের সংযোগস্থল বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এর আগে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনাতেও হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এসব হামলায় কয়েক ডজন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।

ইরানের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ

হুথিদের সামরিক অগ্রগতির পাশাপাশি ইয়েমেনে ইরানের ভূমিকা নিয়েও উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ইয়েমেনে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কয়েক শ সদস্য অবস্থান করছেন এবং তারা হুথিদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন।

মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, হুথিদের সহায়তার মাধ্যমে ইরান শেষ পর্যন্ত বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে নৌ চলাচল বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে পারে। এমনটি হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।

সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও ইয়েমেনে আইআরজিসির উপস্থিতি সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য থাকার কথা জানিয়েছেন। সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোয় সাম্প্রতিক হুথি হামলার পেছনে ইরানের ভূমিকা রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

সৌদি অভিযানে মার্কিন সহায়তা নতুন নয়

হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা এবারই প্রথম নয়। বারাক ওবামা ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও সৌদি বাহিনীকে গোয়েন্দা তথ্য এবং হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করেছিল ওয়াশিংটন।

তবে ওই সময় সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানে বেসামরিক হতাহতের ঘটনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র নিজেও কয়েক মাস হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। পরে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সেই অভিযান বন্ধ করা হয়। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের একাংশের মতে, ওই অভিযান কীভাবে শেষ করা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছিল না।

একাধিক সংঘাতে চাপে মার্কিন বাহিনী

এদিকে ইরানের সঙ্গে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। মার্কিন সেনারা নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সেনা মোতায়েন এবং অস্ত্রের মজুত নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালিতেও মার্কিন বাহিনী বড় ধরনের সামরিক তৎপরতা চালাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা, বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দেওয়া এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ বজায় রাখা।

এ পরিস্থিতিতে সৌদি-হুথি সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র কতটা সরাসরি জড়াবে, তা নিয়ে মার্কিন সামরিক মহলে সতর্কতা রয়েছে। বিশেষ করে কোনো মার্কিন সহায়তাপ্রাপ্ত অভিযানে বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটলে অতীতের মতো ওয়াশিংটনকে আবারও আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়তে হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *