ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদিকে কেন্দ্র করে কবি জিয়া হকের রচিত বিপ্লবী কবিতা ও গানগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভূতপূর্ব আলোড়ন তুলেছে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই এসব কবিতা ও সংগীত মিলিয়ে শত মিলিয়নের কাছাকাছি ভিউ অর্জন করেছে, যা এখন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। চার দিন আগে রিলস প্ল্যাটফর্মে বিশ্বজুড়ে শীর্ষ সার্চে উঠে আসে জিয়া হকের নাম। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক আলোচিত ব্যক্তিত্ব জোহরান মামদানিকেও পেছনে ফেলে ওই সময় টপ সার্চে ছিলেন তিনি।
কবি জিয়া হকের লেখা ‘হাদির জিন্দাবাদ’ গানটি শিল্পী আবু উবায়দার ফেসবুক পেজে প্রকাশের মাত্র দুই দিনেই ৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন ভিউ পায়, যা বর্তমানে ১১ মিলিয়ন ছাড়িয়েছে। ইউটিউবে গানটি ইতোমধ্যে তিন মিলিয়নের বেশি দর্শক দেখেছে। শুক্রবার প্রকাশিত ‘কালচারাল হিরো’ শিরোনামের সংগীতটির ট্রেলার আবু উবায়দার ফেসবুক থেকে একদিনেই ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন ভিউ অর্জন করে, যদিও গানটি এখনো ইউটিউবে প্রকাশ হয়নি।
এদিকে কবিতা ‘গুলি-টুলি হাদিদের চুলটাও ছেঁড়ে না’ প্রকাশের দুদিনের মধ্যেই ১২ মিলিয়নের বেশি ভিউ পেয়ে নতুন রেকর্ড গড়ে। বিশেষ করে বিজয় দিবসে কবিতাটি একদিনেই ১০ মিলিয়ন ভিউ অতিক্রম করে আলোচনার নতুন মাত্রা যোগ করে। একই সময়ে আবু উবায়দার কণ্ঠে ইউটিউবে প্রকাশিত গান ‘হাদি তুই ফিরে আয়’ পাঁচ মিলিয়নের বেশি ভিউ পেয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
এই কবিতা ও গানগুলো শুধু ইউটিউবেই সীমাবদ্ধ নেই; ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকেও সমানতালে ছড়িয়ে পড়ছে। ভিউয়ের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ওসমান গণির অ্যাকাউন্ট থেকে এসেছে ৬ দশমিক ২ মিলিয়ন এবং মহিউদ্দিন হাসান খানের অ্যাকাউন্ট থেকে এসেছে প্রায় দুই মিলিয়ন ভিউ।
‘হাদিই আঁধার-পর্দা সরায়ে নতুন ভোরের রবি,
হাদি জুলাইয়ের অগ্রনায়ক বিদ্রোহী বিপ্লবী,
নতুন সময়ে নতুন সফরে নতুন সিন্দাবাদ,
সাত আসমান ভেদ করে ওঠে হাদির জিন্দাবাদ।’
‘হাদির জিন্দাবাদ’ গানটির এমন পঙ্ক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার হাজারবার শেয়ার হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় এসব চরণ দিয়ে দেয়াল লিখন হচ্ছে। অসংখ্য মানুষ নিজ নিজ কণ্ঠে গান গেয়ে কিংবা আবৃত্তি করে তা সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করছেন। বাবা-মা সন্তানদের সঙ্গে, শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে দলবদ্ধভাবে গান ও আবৃত্তি করে ভিডিও শেয়ার দিচ্ছেন।
গবেষক ও চিন্তক আমান আবদুল্লাহ তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘হাদি ওমরের অর্ধজাহান মোড়ানো শীতলপাটি! ফররুখ আহমদের পর এই বাংলাকে বিশ্বসভ্যতা ও ইসলামের সঙ্গে এত গভীর ও প্রামাণ্যভাবে যুক্ত করার এমন উপমা আর চোখে পড়েনি।’
লেখক ও উপস্থাপক ইকবাল খন্দকার তার প্রতিক্রিয়ায় লেখেন, ‘এটি শুধু গান নয়, এটি একেকটি হুংকার। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বহু কালজয়ী গান থাকলেও পরবর্তী আন্দোলন-সংগ্রামগুলোকে ঘিরে উল্লেখযোগ্য কোনো গান তৈরি হয়নি। জুলাই বিপ্লবের সময়ও পুরনো গান-কবিতার ওপরই ভর করতে হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর যেন হঠাৎ করেই জন্ম নিল এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি—“হাদি তুই ফিরে আয়”। জিয়া হকের লেখা, আবু উবায়দার কণ্ঠ—কথা, সুর আর গায়কীর এমন সম্মিলন রক্তে আগুন ধরিয়ে দেয়।’
তার ভাষায়, ‘এই একটি গানই হাদিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট। একদিন যদি কোথাও হাদির নাম উচ্চারিত না-ও হয়, এই গান বাজলেই সে আবার সামনে এসে দাঁড়াবে। তরুণ প্রজন্ম জানবে, হাসতে হাসতেও জীবন উৎসর্গ করা যায়।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তাজুল ইসলাম, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমসহ বহু রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, লেখক ও বুদ্ধিজীবী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘হাদির জিন্দাবাদ’ সংগীতটি শেয়ার করেছেন।
এ প্রসঙ্গে কবি জিয়া হক বলেন, ‘কবিতার কোনো কদর নেই—এমন কথিত সময়ে দাঁড়িয়ে এই সাড়া পাওয়া আমার কাছে অবিশ্বাস্য। কয়েকটি কবিতা ও গান কোটি মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে গেছে। গত এক সপ্তাহে হাজার হাজার বার্তা পেয়েছি—সবগুলোই ভালোবাসা ও আবেগে ভরা। শ্রোতাদের কণ্ঠে চোখভেজা দরদ আর কাঁপা অনুভূতি আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এই ভালোবাসা আমাকে আরও লিখতে সাহস জোগাবে।’
অনেক লেখক, কলামিস্ট ও বুদ্ধিজীবী ‘হাদির জিন্দাবাদ’কে একটি মাস্টারপিস হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। একই সঙ্গে শিল্পী আবু উবায়দা ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী এক মাসে তার ইউটিউব চ্যানেল থেকে প্রাপ্ত সম্পূর্ণ আয় তিনি হাদির পরিবারের কাছে তুলে দেবেন।
এছাড়া বাচিকশিল্পী মৃন্ময় মিজান, কবি দ্রিপ্র হাসান, বাচিকশিল্পী কঠোর হাসানসহ হাজারো শ্রোতা এসব কবিতা ও গান আবৃত্তি ও পরিবেশন করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন, যা এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পরিসর আরও বিস্তৃত করেছে।
সূত্রঃ আমার দেশ
