প্রধানমন্ত্রীর সফর: দিল্লিতে কূটনৈতিক তৎপরতা ও উদ্বেগ

সংক্ষিপ্তসার: সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের আমন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ভারতের গণমাধ্যম ও সাবেক কূটনীতিক মহলে একধরনের অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানের সফর নিয়ে এমন প্রতিক্রিয়া যেন দীর্ঘদিনের আধিপত্য হারানোর হতাশারই বহিঃপ্রকাশ।

১. আধিপত্যবাদের অবসান ও নতুন পররাষ্ট্রনীতি

শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে বাংলাদেশের ওপর ভারত একধরনের প্রভুত্ব কায়েমের চেষ্টা চালিয়েছিল। জনসমর্থনহীন একটি সরকারকে টিকিয়ে রেখে দিল্লি তাদের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত স্বার্থ আদায় করে নেয়। সে সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেন দিল্লির সাউথ ব্লকের একটি এক্সটেনশনে পরিণত হয়েছিল।

তবে ২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সেই আধিপত্যবাদের অবসান ঘটে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের হাত ধরে বাংলাদেশ দাসত্বের নীতি থেকে বেরিয়ে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ শুরু করে। আর দিল্লির কাছে এই স্বাধীনতাই ছিল সবচেয়ে বড় আঘাত।

২. ভারতের গণমাধ্যমে চরিত্রহননের অপচেষ্টা

ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও গণমাধ্যমগুলো আশা করেছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের পর নির্বাচিত সরকারগুলো আবারও তাদের স্বার্থপূরণের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থান দেশের মানুষের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ ফিরিয়ে এনেছে।

দিল্লির নীতিনির্ধারকরা হয়তো ভেবেছিলেন, আগের মতো আমন্ত্রণ পেলেই বিনা বাক্যে দিল্লির পথে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু দণ্ডিত কোনো অপরাধীর বিদেশ থেকে রাজনৈতিক তৎপরতা চালানো এবং বন্ধুত্বের আবহ নষ্ট হওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে—সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন। এতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই।

৩. অমূলক ভয়ভীতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা

বাংলাদেশের এই স্বাবলম্বী অবস্থান মেনে নিতে না পেরে ভারতের কিছু গণমাধ্যম ও বিশ্লেষক নানা ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করেছেন। যেমন—

  • বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ: অনেকেই বলছেন ভারত ডিজেল বা বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশের কী হবে? অথচ বাস্তব কথা হলো, বাংলাদেশ কোনো কিছুই বিনা মূল্যে নেয় না এবং ভারত থেকে আমদানিকৃত ডিজেল মোট চাহিদার দশ ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম।
  • বিদ্যুৎ খাতের অস্বচ্ছতা: ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তির পেছনে অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি চার্জ এবং তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক অভিসন্ধি জড়িত ছিল। ত্রিপুরায় পালাটানা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবকাঠামো ব্যবহার করে একপক্ষীয় সুবিধা নেওয়া হয়েছে।

৪. ত্রিদেশীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে শোরগোল

ভারতীয় গণমাধ্যমে সম্প্রতি নতুন একটি ইস্যু তৈরি হয়েছে—সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ত্রিদেশীয় প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান নিয়ে। এ নিয়ে ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা গেছে।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে সামনে রেখে ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখছে। দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় ইতিবাচক কোনো সুযোগ এলে বাংলাদেশ তা বিবেচনা করবেই। ভারতের সঙ্গে অন্য কোনো দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রিত হতে পারে না।

৫. উপসংহার

দিল্লির সাম্প্রতিক শোরগোল মূলত বিগত দেড় দশকে হারানো প্রভুত্ব ফিরে পাওয়ার বেদনারই প্রতিফলন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কেবল একটি সরকারের পতন ঘটেনি, বরং বাংলাদেশের ওপর দিল্লির একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটেছে। বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে যে আত্মমর্যাদা অর্জন করেছে, তা থেকে পিছিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

লেখাটি আপনার পছন্দ অনুযায়ী পরিমার্জন ও বিন্যাস করা হয়েছে। এতে মূল ভাব ও তথ্য পুরোপুরি অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে।

সূত্রঃ আমার দেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *