পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীতে যে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, তা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়। ঘটনার বিচার দাবি করা সৎ ও দেশপ্রেমিক বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা—যারা তদন্ত, আলামত সংগ্রহ ও উদ্ধারকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন—তাদের ধীরে ধীরে বাহিনী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ‘তাপস হত্যাচেষ্টা মামলা’ নামে কয়েকজনকে আটক করে নির্যাতনের অভিযোগও সামনে আসে।
স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই মামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল সেনাবাহিনীর ভেতরে ‘ইসলামি জঙ্গিবাদ’ রয়েছে—এ ধারণা বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা এবং বিডিআর বিদ্রোহে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সেনা কর্মকর্তাদের মুখ বন্ধ রাখা। এ লক্ষ্যেই পাঁচজন জুনিয়র অফিসারকে বেছে নেওয়া হয়। তারা সবাই বিডিআর বিদ্রোহের সময় উদ্ধার, তদন্ত, সমন্বয় ও আলামত সংগ্রহে সরাসরি যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন পর্যায়ে সোচ্চার অবস্থান নিয়েছিলেন।
রিপোর্টে উল্লেখ আছে, তাপসকে আজীবন নিরাপত্তার অজুহাতে এবং সেনাবাহিনীতে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে পুরোপুরি সাজানো ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই মামলা দাঁড় করানো হয়—যাতে কেউ আর পিলখানা ঘটনার রাজনৈতিক দিক নিয়ে কথা বলতে না পারে। এমনকি প্রথমবারের মতো ইউনিফর্মধারী সেনাসদস্যদের গুম করে ‘জঙ্গিবাদের’ বর্ণনা দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়। বড় রাজনৈতিক ব্যক্তি, আমলা বা বিশিষ্ট নাগরিকদের গুম-হত্যার মতো কর্মকাণ্ডও যাতে বাধাহীনভাবে চালানো যায়—সে ধরনের এক ফ্যাসিবাদী পরিবেশ তৈরির দিকেই ধীরে ধীরে পরিস্থিতি নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মামলার বাদী ফজলে নূর তাপস নিজেই কোনো গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য দিতে পারেননি। পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে ভিত্তিহীন ঘোষণা করে এবং কোনো সামরিক কর্মকর্তার নাম মামলায় ছিল না—এ কথাও স্পষ্ট করে।
সুবিচারের জন্য সোচ্চার থাকা পাঁচজন অফিসার ছিলেন—ক্যাপ্টেন রেজাউল করিম, ক্যাপ্টেন খন্দকার রাজীব হোসেন, মেজর হেলাল, ক্যাপ্টেন সুবায়েল বিন রফিক এবং ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ফুয়াদ খান। এদের সবাইকে হঠাৎ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, যেন তাদের কাছে থাকা গুরুত্বপূর্ণ আলামত বা তথ্য জনসমক্ষে না আসে এবং তাদেরকেই অপরাধী বানিয়ে ভয়ংকর একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করা যায়।
রিপোর্টে আরও উঠে আসে, তৎকালীন ডিজিএফআইয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা—মেজর জেনারেল ফজলে আকবর, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সালেহ ও কর্নেল আজিজ—মামলাটিকে ভিন্ন খাতে নিতেই সরাসরি ভূমিকা পালন করেন।
গোয়েন্দা সংস্থার অনুমতি ছাড়া তদন্ত কমিটিকে কোনো আলামত দিতে বারবার বাধা দেওয়া হয়েছিল। এমনকি অমান্য করায় ক্যাপ্টেন ফুয়াদ ও অন্যদের তুলে নেওয়া, আটক রাখা, জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন এবং সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার মতো অভিযোগও উঠে আসে। আটক কর্মকর্তারা আদালতে উপস্থিত হয়েছিলেন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া অবস্থায়—এমন বর্ণনাও পাওয়া যায় সাক্ষ্যে।
যে আলামত উপস্থাপন করা হয়েছিল—মোবাইল যোগাযোগ, বিস্ফোরক, ডেটোনেটর, অস্ত্রভর্তি ট্রাংক—সবই বিভিন্ন ইউনিট কমান্ডারের সাক্ষ্যে অবিশ্বাস্য ও অগ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রমাণিত হয়। এমনকি যে ট্রাংকভর্তি অস্ত্র উদ্ধারের কথা বলা হয়, সংশ্লিষ্ট ইউনিট জানায়—এ ধরনের কোনো উদ্ধার অভিযান কখনোই হয়নি; হলে সেটি ইউনিটজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে যেত।
প্রথম দফার তদন্তে কোনো প্রমাণ না পাওয়ার পরও অভিযুক্তদের দীর্ঘ এক মাস ধরে নির্যাতন করা হয় এবং পরে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার পর টাইপ করা স্বীকারোক্তিতে সই করতে বাধ্য করা হয়। পরবর্তী সামারি অব এভিডেন্স এবং কোর্ট মার্শালের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন সেই কর্মকর্তারাই, যারা তদন্ত আদালতে পরে যোগ দিয়েছিলেন। আটক কর্মকর্তাদের পরিবারও ব্ল্যাকমেইল ও হয়রানির মুখে পড়েন।
সব মিলিয়ে তথাকথিত ‘তাপস হত্যাচেষ্টা মামলা’কে তদন্ত কমিশন একটি সাজানো নাটক হিসেবে বর্ণনা করেছে—যার উদ্দেশ্য ছিল সত্য আড়াল করা, সেনাবাহিনীকে স্থবির ও ভয়ভীত রাখা এবং পিলখানার মূল রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাকে ঢাকা দেওয়া।
সূত্রঃ আমার দেশ
