বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতেও একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টায় জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘কান্তেই’তে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের বিষয়টি জানান প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন।
বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও শিল্পায়নের লক্ষ্য অর্জনে জাপান সরকার এবং দেশটির বেসরকারি খাতের আরও সক্রিয় অংশগ্রহণ কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বাংলাদেশকে অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও উৎপাদনশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের মানুষের কাছে জাপানের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জাপান প্রথমদিকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর অন্যতম। স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা, শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার অভিন্ন প্রত্যাশার ভিত্তিতেই দুই দেশের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
এ সময় নিজের পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দুইবার জাপান সফর এবং মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক উন্নয়নে অবদানের কথা স্মরণ করেন তারেক রহমান। তাদের দেখানো পথ অনুসরণ করে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিনিয়োগে গুরুত্ব
বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে জাপানের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় সম্প্রতি দেওয়া ৫০ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের জরুরি সহায়তা ঋণের বিষয়টি উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠকে জ্বালানি, অবকাঠামো ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দ্রুত বাংলাদেশে জাপানি প্রতিনিধিদল পাঠানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
বাংলাদেশে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে তার সরকার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, করনীতি, শুল্ক ছাড়করণ এবং অর্থ স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি দ্রুত কার্যকর করার প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি বলেন, দুই দেশের জনগণ যাতে এ চুক্তির সুফল পায়, সে জন্য উভয় পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব
প্রযুক্তি ও গবেষণানির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মাধ্যমে জাপানের বিভিন্ন কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ মেধাবী, উদ্যোক্তা এবং প্রযুক্তি খাতের দক্ষ জনশক্তির সংযোগ তৈরির ওপর জোর দেন তিনি।
প্রস্তাবিত টেক পার্কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে মহাকাশবিজ্ঞান, স্যাটেলাইট প্রকৌশল এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে জাপানের উন্নত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
দ্রুতগতির রেল ও উড়াল সড়ক নির্মাণে সহযোগিতা কামনা
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে আধুনিক ও সমন্বিত যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক এবং দেশব্যাপী উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
এসব বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রণয়ন, কারিগরি সহায়তা, বিনিয়োগ ও অর্থায়নে জাপানের সহযোগিতা কামনা করেন তারেক রহমান। জাপানের অবকাঠামো উন্নয়ন ও আধুনিক পরিবহনব্যবস্থায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে অভিন্ন অবস্থান
জাতিসংঘ, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে আলোচনা করেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। এ সময় বহুপাক্ষিক সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক শান্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে দুই দেশের অভিন্ন অঙ্গীকারের বিষয়টি উঠে আসে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচনে জাপানের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তারেক রহমান। বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাপানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যাশাও জানান তিনি।
একটি অবাধ, উন্মুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আঞ্চলিক যোগাযোগ, অবাধ বাণিজ্যপ্রবাহ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে প্রত্যাবাসনের ওপর জোর
মিয়ানমারের ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতি এবং এর ফলে সৃষ্ট রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুতি সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ, নির্বিঘ্নে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের মানবিক প্রচেষ্টায় জাপানের সহযোগিতার প্রশংসা করেন তিনি। একই সঙ্গে রাখাইনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে জাপানের সক্রিয় সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
তারেক রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত। রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে দ্রুত নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব
দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর পর্যায়ে নিতে মন্ত্রীপর্যায়ের একটি যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। এ কমিশনের মাধ্যমে অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতগুলো চিহ্নিত করা, চলমান উদ্যোগের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং সহযোগিতার সম্ভাবনাগুলোকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়ার কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠকের সমাপনী বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এই শীর্ষ বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। আরও গভীর আস্থা, বিস্তৃত অর্থনৈতিক সহযোগিতা, শক্তিশালী বিনিয়োগ সম্পর্ক এবং শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির অভিন্ন প্রত্যাশার ভিত্তিতে এই সম্পর্ক এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বৈঠকে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের অভিন্ন লক্ষ্য আরও সুদৃঢ় হয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান তিনি।
পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও অভিন্ন সমৃদ্ধির ভিত্তিতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও জাপানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীর ও বিস্তৃত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারেক রহমান।
