১১ দলের ব্রিফিংয়ে মামুনুল হক: শহীদদের রক্তের দায়বদ্ধতা নিয়ে মাঠে নেমেছি, ষড়যন্ত্রে পা দেব না

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, তারা কোনো তামাশা করতে মাঠে নামেননি; বরং সংবিধান সংস্কার ও রাষ্ট্র মেরামতের দাবি নিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন। হাজারো শহীদের রক্তের দায়বদ্ধতা থেকে তারা এই কর্মসূচি পালন করছেন। তাই কোনো ষড়যন্ত্র বা চক্রান্তে পা দেবেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন মামুনুল হক।

তিনি বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি জনগণের ঐক্য। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রূপরেখা ও গতিপথ নির্ধারণ, আধিপত্যবাদ মোকাবিলা এবং ফ্যাসিবাদের পথ বন্ধ করার লড়াইয়ে তারা একসঙ্গে রয়েছেন। সময়ের সঙ্গে এই ঐক্যের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এর আগে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে ১১ দলের শীর্ষ নেতা ও মহাসচিবরা অংশ নেন। আগামী ৩১ অক্টোবর নির্ধারিত ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করতেই এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

সম্প্রতি গোপালগঞ্জে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনার পর ওই এলাকা দিয়ে লংমার্চ যাওয়ার সময় কোনো হামলার আশঙ্কা রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে মামুনুল হক বলেন, তারা এ ধরনের আশঙ্কা করছেন না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক থাকলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা থাকবে না। তারা স্বাভাবিকভাবেই কর্মসূচি পালন করবেন।

তিনি আরও বলেন, দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও মাঠে রয়েছেন। গোপালগঞ্জে বিপুলসংখ্যক ইসলামপন্থি ও দেশপ্রেমিক মানুষ রাজপথে উপস্থিত থাকবেন বলে তারা আশা করছেন। কোনো ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতা বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের চেষ্টা হলে রাজপথেই তা মোকাবিলা করা হবে। এ বিষয়ে গোপালগঞ্জ প্রশাসনকে যথাযথ দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে এর দায় সরকার ও প্রশাসনকে নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মামুনুল হক জানান, গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ নাগরিক জীবনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্য দেশব্যাপী কর্মসূচি পালন করছে। এর অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম ও রংপুরে লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ধারাবাহিক কর্মসূচির পরবর্তী ধাপে আগামী ৩১ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা হয়ে কুষ্টিয়া পর্যন্ত লংমার্চ করা হবে।

এই কর্মসূচির মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ ও সারের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, দলীয়করণ বন্ধ, শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ড, জুলাই গণহত্যা ও শাপলা চত্বরের গণহত্যাসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দাবি তুলে ধরা হবে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, আগের দুটি লংমার্চের মতো এবারও ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি সফল হবে বলে তারা আশাবাদী। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন তিনি। একই সঙ্গে কোনো পক্ষ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তা মোকাবিলা করে লংমার্চ সফল করার কথাও জানান।

দেশবাসীর উদ্দেশে মামুনুল হক বলেন, বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে সব দেশপ্রেমিক নাগরিকের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ কামনা করছেন তারা।

তিনি জানান, ৩১ অক্টোবর সকাল ৭টায় বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে লংমার্চ শুরু হবে। এরপর বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে কর্মসূচিটি কুষ্টিয়ায় গিয়ে শেষ হবে। লংমার্চ সফল করতে গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

চলমান জাতীয় সংকট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মামুনুল হক বলেন, সংসদ ও রাজপথে তারা এখন পর্যন্ত সরকারকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে সহনশীল কর্মসূচি পালন করেছেন। তবে সরকারের আচরণে মনে হচ্ছে, বিরোধী দলের এই সহযোগিতা গ্রহণে তারা আগ্রহী নন। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে প্রয়োজনে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। জনগণের প্রত্যাশা অনুধাবন করে সরকারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিরপেক্ষ হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে মামুনুল হক বলেন, নির্বাচন কমিশনের সচিব পর্যায়ে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা উদ্বেগ তৈরি করেছে। ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনেও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোনো ব্যত্যয় ঘটলে তারা নীরব থাকবেন না। প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বৃহত্তর কর্মসূচি দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।

পুলিশের মহাপরিদর্শকের সাম্প্রতিক বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আইজিপির মন্তব্য উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি করেছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে বিচারবহির্ভূত ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে এমন বক্তব্য আসা নিয়ে তিনি বিস্ময় ও শঙ্কা প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় সফরের সফরসঙ্গীদের তালিকা নিয়েও অসন্তোষ জানান মামুনুল হক। তার দাবি, তালিকায় এমন ব্যক্তিদের রাখা হয়েছে, যাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্ব বা প্রটোকল নেই। রাষ্ট্রীয় সফরকে বিনোদন ও ঘোরাঘুরির সফরে পরিণত করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, দেশ পরিচালনা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

আসন্ন সংসদ অধিবেশন সম্পর্কে তিনি বলেন, চতুর্থ অধিবেশন সামনে রেখে বিরোধী দলের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে তারা সন্দিহান। অধিবেশনের আগে বিরোধী দল আবার বৈঠকে বসবে এবং পরবর্তী করণীয় জানাবে।

ভারতের গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকের অভিযোগ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্পাদক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, যারা এ ধরনের অভিযোগ করছেন, তারা সম্ভবত ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। ফলে তারাই বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন।

সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় নাগরিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ জোটের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *