গজলডোবার গেট খুলে দিল ভারত, প্লাবনের আশঙ্কায় নির্ঘুম তিস্তাপাড়া

কোনো নোটিশ ছাড়াই গজলডোবা গেট খুলে ভারত — তিস্তা তীরে রাতভর শঙ্কা

কোনো পূর্ববিজ্ঞপ্তি না দেয়ে ভারত নিয়ন্ত্রিত গজলডোবা ব্যারাজের সব গেট একসারি খুলে দেওয়া হয়েছে। তিস্তা ব্যারাজ কন্ট্রোল রুম ও বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, এই বিশাল পানির স্রোত ছাড়ার বিষয়ে তাদের কোন তথ্য ছিল না।

ভারত বরাবরই এমন পদক্ষেপ নিয়েছে যে, শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশকে পানি সংকটে ফেলে, বর্ষার সময়ে ভাটির দেশ বরাবর আকস্মিক পানি ছেড়ে প্লাবন সৃষ্টি করে নদীর তীরবর্তী জনপদকে দুর্বিষহ দুর্যোগের মুখে ফেলে।

রোববার সন্ধ্যায় ভারতের উত্তরাঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রেক্ষিতে গজলডোবার সব গেট খুলে দেয়। এই সময় গজলডোবার উজানে—সিকিম, দার্জিলিং ও জলপাইগুড়িসহ—প্রচুর বর্ষণ হয়। ফলস্বরূপ, তিস্তার পানি বিপজ্জনক মাত্রায় বৃদ্ধি পায়।

পানি বৃদ্ধি ও বিপদসীমা অতিক্রম

  • সন্ধ্যা ৬টা: তিস্তার পানি ৫২.২৫ মিটারে রেকর্ড হয় — বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার উপরে
  • রাত ৯টা: বৃদ্ধি পেয়ে পানি বিপদসীমার ৩৩ সেন্টিমিটার উপরে পৌঁছায়
  • রাত ১২টা: পানি ৫২.৫০ মিটারে যায় — বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার উপরে

ডালিয়া ব্যারাজ পয়েন্টে নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানিয়েছেন, রাত ১২টায় বিপদসীমার ৩৬ সেন্টিমিটার উপরে পানি দেখা দিয়েছিল। সকাল ছয়টায় আবারও পানির স্তর বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার উপরে ছিল।

প্লাবিত অঞ্চল ও ক্ষয়ক্ষতি

এর প্রভাব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়েছে পাশের উপজেলা ও ইউনিয়নগুলিতে —
পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম, শ্রীরামপুর, হাতীবান্ধা, গড্ডিমারী, সিন্দুর্না, কালীগঞ্জের কাকিনা ও চন্দ্রপুরসহ একাধিক এলাকায় পানি ঢুকে গেছে।
হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল ভেসে গেছে; সবজি ও মরিচ ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পুকুরের মাছ অনেকেই পানিবন্দি হয়ে যাচ্ছে।

লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা এলাকায় তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট ২৪ ঘণ্টা ধরে খোলা রাখা হয়েছে, কিন্তু পাউবো কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে।

ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা — ভারতের আচরণ অমানবিক

গড্ডিমারীর সাবেক শিক্ষক শহিদার রহমান বললেন,

গজলডোবা ব্যারাজ বাংলাদেশের জন্য বিষফোঁড়া — বর্ষাকালে পানি ছেড়ে দেওয়া, শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে ফেলা — সবকিছুর দায়ভার אנו বহন করি।

দহগ্রামের মালেকা বেগম জানান,

রাতে পানি বাড়তে শুরু করেছে। সারারাত গরু-ছাগল নিয়ে যন্ত্রণা হয়। রাতভর জেগে ছিলাম — বিশ্রাম বলতে কিছুই ছিল না।

আদিতমারীর মহিষখোঁচা গ্রামের বিলকিছ বেগমসহ অনেকেই পারিবারিক আশ্রয় খুঁজেছেন—কারণ আগ্রসারী পানিতে বাড়ি ও বাড়ির আশেপাশের এলাকা বিপন্ন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনের সতর্কতা এবং প্রস্তুতি

  • লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. শায়খুল আরিফিন জানান,
    চলতি মৌসুমে রোপা আমন, চিনাবাদাম ও সবজি চাষ হয়। যদি পানি তিন-চার দিন টেকসই হয়ে থাকে, তাহলে ক্ষতি বেশি হবে।
  • পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার বললেন,
    “পরিস্থিতি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। নদীপাড়ের মানুষকে মাইকিং ও সর্তকবার্তা দেয়া হচ্ছে।”
  • জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার জানান,
    উজান ও বাংলাদেশে ভারি বর্ষণ মিলিতভাবে তিস্তাকে বিপদসীমার ওপরে নিয়ে গেছে। জেলা প্রশাসন সকল ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে।

সূত্রঃ আমার দেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *