দেশজুড়ে সারের সংকট, ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া জনসমক্ষে প্রকাশ এবং অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব দাবি জানানো হয়। লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার।
ব্রিফিংয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংকট বিরাজ করছে। সার ডিলার নিয়োগে দলীয় প্রভাব বিস্তারের কারণে কৃষি খাত ও সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাঁর অভিযোগ, সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে সার বিতরণ ও ডিলার নিয়োগে অনিয়ম এবং দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কৃষিমন্ত্রীর হলেও এ বিষয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তাঁর অভিযোগ, জেলা পর্যায়ের ডিলার নিয়োগ কমিটিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করায় যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। অর্থের বিনিময়ে ডিলার নিয়োগের কারণে সার বিতরণব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
জামায়াতের এই নেতা আরও অভিযোগ করেন, সরকারি অব্যবস্থাপনা, ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, কালোবাজারে সার বিক্রি ও চোরাচালানের কারণে দেশে সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শর্তও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। দিনাজপুর ও রংপুরের বদরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় দলীয় প্যাডে তৈরি তালিকা এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ডিলার নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘দ্য ডিসেন্ট’-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ১৪ জন সংসদ সদস্যের নির্বাচনি এলাকায় সারের তীব্র সংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে। এতে কৃষকদের দুর্ভোগের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ডিলার নিয়োগে আরও নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক এলাকার বাসিন্দাকে অন্য এলাকায় ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও অনেকে এই সুযোগ পেয়েছেন। একই পরিবারের একাধিক সদস্যের ডিলারশিপ পাওয়া এবং ভুয়া গুদাম ও চুক্তিনামা ব্যবহার করে লাইসেন্স নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় ডিলার নিয়োগের তালিকায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতাদের নাম একসঙ্গে থাকার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের অভিযোগ, নীতিমালা অনুসরণ না করে ডিলারশিপ বণ্টন করা হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশনাও উপেক্ষা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির পরিবর্তে এখন ‘সবার আগে দল’ প্রাধান্য পাচ্ছে।
ডিলার নিয়োগে অনিয়ম তদন্তসহ জামায়াতের ছয় দাবি
সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ছয় দফা দাবি তুলে ধরে দলটি। দাবিগুলো হলো—
১. ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
২. ডিলার নিয়োগের যোগ্যতার শর্ত, তালিকা তৈরির পদ্ধতি এবং লাইসেন্স দেওয়ার ভিত্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
৩. ডিলারশিপ দেওয়ার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. সারের সংকট নিয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতির অসংগতি যাচাই করে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করতে হবে।
৫. ডিলার নিয়োগের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষকে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং তদন্তের অগ্রগতি জনগণকে জানাতে হবে।
৬. প্রমাণ ছাড়া রাজনৈতিক বক্তব্য বা ভিত্তিহীন অভিযোগের মাধ্যমে কাউকে দায়ী না করে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ যাচাই করতে হবে।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অভিযোগ করেন, সারের সংকট নিয়ে সরকার জনগণকে সঠিক তথ্য দিচ্ছে না। গত ছয় থেকে সাত মাসে সরকারি বিভিন্ন পর্যায়ে দলীয়করণ, দুর্নীতি এবং মন্ত্রীদের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য নিয়ে দলটি উদ্বিগ্ন বলেও জানান তিনি। সরকারের ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপানোর চেষ্টা বন্ধ করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দমন-পীড়নমুক্ত একটি মানবিক এবং ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ড সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিরোধী দলকে উপেক্ষা করে নিজেদের সুবিধামতো সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, গণভোটে নির্ধারিত আইনি কাঠামো অনুসরণ করেই সংবিধান সংশোধন করা উচিত। রাজপথে নতুন করে সংকট তৈরি না করে আগামী সংসদ অধিবেশনে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি সার, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
ব্রিফিংয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল ও অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের একাধিক নেতা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য এবং সংসদ সদস্য মো. আব্দুর রব, অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহ, অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, মোবারক হোসাইন, নূরুল ইসলাম বুলবুল, মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ও ড. রেজাউল করিম।
