প্রশাসনের নীরবতায় লালমাই পাহাড়ে অবাধ লুট, ভয়ে মুখ খুলছে না এলাকাবাসী

পরিবেশ অধিদপ্তরের আইনকে তোয়াক্কা না করে কুমিল্লায় দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে পাহাড় কেটে যাচ্ছে একটি প্রভাবশালী চক্র। জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তায় দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে এই সিন্ডিকেট। প্রশাসনের নজর এড়িয়ে রাতের অন্ধকারে চলছে পাহাড় ধ্বংসের উৎসব। ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না স্থানীয় বাসিন্দারাও।

সরেজমিনে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার সালমানপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পরিবেশের জন্য চরম ক্ষতিকর পাহাড় কাটার কার্যক্রম এখানে দীর্ঘদিন ধরে চলমান। সালমানপুর ও বিজয়পুর এলাকার অন্তর্ভুক্ত ঐতিহ্যবাহী লালমাই পাহাড়—যা স্থানীয়দের কাছে ‘লাল মাটির পাহাড়’ নামে পরিচিত—এর বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে কেটে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দিনের বেলায় এলাকায় তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়ে না। কিন্তু রাত নামলেই ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে পাহাড়খেকোরা। এক্সকাভেটর ও ড্রাম ট্রাক ব্যবহার করে পাহাড় কেটে লাল মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যা বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বিপুল অর্থ।

এ বিষয়ে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুজন চন্দ্র রায় বলেন, পাহাড় কাটার তথ্য পেলেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে বাস্তবতা হলো, পাহাড় কাটায় জড়িত চক্রটি এতটাই শক্তিশালী যে সাধারণ মানুষ ছাড়াও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালীরাও মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বাসিন্দা জানান, এই চক্রের বিরুদ্ধে কথা বললে হুমকি, হয়রানি এমনকি প্রাণনাশের আশঙ্কা রয়েছে। ফলে কেউই প্রকাশ্যে তথ্য দিতে রাজি হচ্ছেন না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি থাকলে রাতের আঁধারে এত ব্যাপকভাবে পাহাড় কাটা সম্ভব হতো না। কার্যকর অভিযান কিংবা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির না থাকায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

পাহাড় ধ্বংসের ফলে ওই এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। বাড়ছে ভূমিধস, জলাবদ্ধতা, কৃষিজমি ক্ষতি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের ঝুঁকি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে পাহাড় কাটা বন্ধ করে জড়িত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া না হলে লালমাই পাহাড় অচিরেই ইতিহাসে পরিণত হবে।

প্রায় ১১ মাইল দীর্ঘ ও দুই মাইল প্রশস্ত লালমাই পাহাড় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ৬(খ) ধারা অনুযায়ী সংরক্ষিত এলাকা। আইন অনুযায়ী পাহাড় ও টিলা কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে ব্যক্তিমালিকানার দাবি তুলে গত দুই দশকে এখানে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে ব্লু ওয়াটার পার্ক, লালমাই লেকল্যান্ড, ডাইনোসর পার্ক, ম্যাজিক প্যারাডাইস, কাশবন পার্ক ও রিসোর্টসহ একাধিক বিনোদন কেন্দ্র। আরও কয়েকটি প্রকল্প বর্তমানে নির্মাণাধীন। এতে এক সময়ের উঁচু পাহাড় ধীরে ধীরে সমতল ভূমিতে রূপ নিচ্ছে।

জামমুড়া, সানন্দা, সালমানপুর ও বড়ধর্মপুরসহ আশপাশের এলাকায় পাহাড়-টিলা কেটে তৈরি করা হয়েছে অসংখ্য বিশাল গর্ত। কোথাও পাহাড় সম্পূর্ণ কেটে সমান করে ফেলা হয়েছে, আবার কোথাও সমতল ভূমির নিচে গভীর কূপের মতো গর্ত সৃষ্টি করা হয়েছে, যা যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে একটি শক্তিশালী মাটি ব্যবসায়ী ও পাহাড়খেকো চক্র।

ম্যাজিক প্যারাডাইসের স্বত্বাধিকারী নাসির উদ্দিন বলেন, ২০১৯ সালে তাদের কাজ শেষ হয়েছিল এবং তখন পাহাড়ের সৌন্দর্য নষ্ট করা হয়নি। বর্তমানে রাতের আঁধারে পাহাড় কাটা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। কারা করছে, প্রশাসন জানে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল হান্নান বলেন, মানুষ ঘুমিয়ে পড়লেই পাহাড় কাটার কাজ শুরু হয়। আগে কারা করত সবাই জানত, এখন কারা করছে সেটাও বোঝা যাচ্ছে। তবে নাম বললে পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। তার দাবি, প্রশাসনের কিছু লোক জড়িত না থাকলে এভাবে মাটি কাটা সম্ভব হতো না।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর মাসুম বলেন, গত এক দশক ধরে তারা পাহাড় কাটা বন্ধে কাজ করে যাচ্ছেন। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠান পাহাড় কেটে পরিবেশ ধ্বংস করছে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। এভাবে চলতে থাকলে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় অনিবার্য।

কুমিল্লা সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জিএম মোহাম্মদ কবির জানান, দিনে পাহাড় কাটার দৃশ্য তারা দেখেননি। নির্দিষ্ট দাগ নম্বর বা এলাকা জানানো হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর কুমিল্লার সহকারী পরিচালক মোসাব্বির হোসেন রাজিব জানান, লালমাই পাহাড়ে পাহাড় কাটার কোনো ধরনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। অনুমতি ছাড়া পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। তথ্য পেলে তারা অভিযান পরিচালনা করছেন এবং এ ঘটনায় একটি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।

সূত্রঃ ইত্তেফাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *