নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ইসরাইলের রাজনীতিতে উগ্রপন্থার বিস্তার

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের শাসনে দেশটির রাজনীতিতে উগ্র ইহুদি জাতীয়তাবাদের প্রভাব ক্রমেই বেড়েছে। ফিলিস্তিনিদের অধিকার, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি বিস্তার, গাজায় সামরিক অভিযান এবং বিচার বিভাগের ক্ষমতা খর্ব করার প্রচেষ্টা—বিভিন্ন ইস্যুতে তার সরকারের কঠোর অবস্থান ইসরাইলি সমাজে বিভক্তি আরও গভীর করেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নেতানিয়াহুর বিরোধীরাও উগ্র ইহুদি জাতীয়তাবাদ ও সামরিক শক্তিনির্ভর রাজনীতির বলয় থেকে বের হতে পারছেন না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ইসরাইলের রাজনীতিকে উগ্রপন্থার দিকে নিয়ে যাওয়াই নেতানিয়াহুর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হয়ে উঠতে পারে।

গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে দাঁড়ান নেতানিয়াহু। এ সময় বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা প্রতিবাদ জানিয়ে অধিবেশনকক্ষ ত্যাগ করেন। তবে এ ঘটনায় বিচলিত না হয়ে তিনি বলেন, ‘নৈতিক সাহসের অভাবে যারা এখনো কক্ষে রয়েছেন, তারাও চাইলে বেরিয়ে যেতে পারেন।’

গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখে থাকা নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য ইসরাইলের অভ্যন্তরে তার সমর্থকদের প্রশংসা অর্জন করে।

নেতানিয়াহুর সাবেক সহযোগী মিচেল বারাক আলজাজিরাকে বলেন, জাতিসংঘের মঞ্চে নেতানিয়াহুর এমন দৃঢ় অবস্থানই তার সমর্থকেরা দেখতে চান। তাদের অনেকের বিশ্বাস, ইসরাইলের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নেতানিয়াহুর বিকল্প নেই।

আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে মোকাবিলা করতে যাচ্ছেন একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী। আদর্শগতভাবে তাদের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য থাকলেও নেতানিয়াহুর বিরোধিতার প্রশ্নে তারা একমত। বিশ্লেষকদের মতে, এই চিত্র দেশটির রাজনীতিতে নেতানিয়াহুর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবেরই প্রমাণ। তার বিরোধী শিবিরের অনেক নেতাও ইহুদি জাতীয়তাবাদ, সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরতা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কঠোর অবস্থানের রাজনীতির বাইরে যেতে পারছেন না।

দীর্ঘ শাসনে শক্তিশালী হয়েছে উগ্র ইহুদি জাতীয়তাবাদ

১৯৪৯ সালে তেল আবিবে জন্মগ্রহণ করেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ১৯৮০-এর দশকে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়ার পর তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৯৬ সালে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে ইসরাইলের সবচেয়ে কম বয়সি প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। এরপর ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত টানা ১২ বছর ক্ষমতায় থেকে রেকর্ড গড়েন। ২০২২ সালে আবারও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ফেরেন নেতানিয়াহু। তার নেতৃত্বাধীন বর্তমান জোটকে ইসরাইলের ইতিহাসে অন্যতম কট্টর উগ্র ইহুদিপন্থি সরকার হিসেবে দেখা হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিমরোদ ফ্লাশেনবার্গের মতে, ইসরাইলের রাজনৈতিক বিভাজনের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠেছেন নেতানিয়াহু। তিনি সব সময় নির্বাচনি প্রচারের আবহ বজায় রাখেন। জনমতের গতিপ্রকৃতি বুঝে রাজনৈতিক জোট গঠন এবং সেই জনমতকে নিজের অনুকূলে পরিচালিত করার ক্ষেত্রেও তিনি দক্ষ।

নেতানিয়াহুর শাসনামলে ইসরাইল তার পূর্বসূরি ইয়িৎসহাক রবিনের অনুসৃত দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথ থেকে ক্রমেই দূরে সরে গেছে। একই সময়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার ঘটনাও বেড়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার পর গাজায় শুরু হওয়া ইসরাইলি সামরিক অভিযান এবং পরবর্তী সংঘাতের সঙ্গে দেশটির সমাজের বড় একটি অংশ ক্রমে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। তবে ওই হামলা প্রতিরোধে নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতার জন্য নেতানিয়াহুকে দায়ী করেন অনেক ইসরাইলি।

২০১৮ সালের জুলাইয়ে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকার ‘জাতি-রাষ্ট্র আইন’ পাস করে। ওই আইনে জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে কেবল ইহুদি জনগণের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি আরবি ভাষার সরকারি মর্যাদা কমানো হয় এবং ইহুদি বসতি স্থাপনকে জাতীয় মূল্যবোধের অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

এরপর অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের (ওসিএইচএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের ১ হাজার ২৯১টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৮৩৫টিতে পৌঁছায়। অন্যদিকে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বাহিনী অথবা বসতি স্থাপনকারীদের হাতে অন্তত ১ হাজার ৭১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২৩৩টি শিশু রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কার্যকর জবাবদিহির অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

নেতানিয়াহুর বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচের মতো বিতর্কিত রাজনীতিকেরা। বেন গভির বর্ণবাদে উসকানি এবং একটি ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠীকে সমর্থনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। অন্যদিকে, স্মোতরিচ প্রকাশ্যেই ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

বামপন্থি হাদাশ দলের বিদায়ী পার্লামেন্ট সদস্য আয়দা তুমা-স্লিমানের অভিযোগ, ইসরাইলি সমাজে আগে থেকেই বিদ্যমান বর্ণবাদী ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতাকে আরও জোরালো করেছেন নেতানিয়াহু। বেন গভির ও স্মোতরিচের মতো নেতাদের সরকারে জায়গা দেওয়ার সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে নেতানিয়াহু আগে থেকেই অবগত ছিলেন বলেও মনে করেন তিনি।

বিচার বিভাগের ক্ষমতা কমানোর উদ্যোগ ও দুর্নীতির মামলা

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনে বিচার বিভাগের ক্ষমতা সীমিত করার প্রচেষ্টা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের বিষয়। ২০১৯ সাল থেকে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চলছে। এসব মামলায় দোষী প্রমাণিত হলে তার কারাদণ্ড হতে পারে। একই সঙ্গে তাকে জবাবদিহির আওতায় আনার চেষ্টা করা বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তার বিরোধও অব্যাহত রয়েছে।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে নেতানিয়াহু ও তার কট্টরপন্থি মিত্ররা বিচারব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নেন। প্রস্তাবিত পরিবর্তন কার্যকর হলে সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর আদালতের তদারকি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়। এর প্রতিবাদে ইসরাইলে নজিরবিহীন বিক্ষোভ শুরু হয় এবং লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।

২০২৪ সালের জুনে নেতানিয়াহু এমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে বিচারব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক বিভাজনের সঙ্গে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর তার সরকারের সমালোচিত প্রতিক্রিয়ার কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে।

জনসমর্থনে ভাটা, তবু একই রাজনৈতিক ধারায় বিরোধীরা

বিভিন্ন জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও তার মিত্রদের সম্ভাব্য আসনসংখ্যার সঙ্গে বিরোধী শিবিরের ব্যবধান খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। তবে নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত সমর্থন কমেছে। ২০২২ সালের নির্বাচনে লিকুদ পার্টি ৩২টি আসন পেয়েছিল। সাম্প্রতিক অধিকাংশ জরিপে দলটির সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ২০ থেকে ২২টির মধ্যে রয়েছে। তার সাবেক কিছু সমর্থক বিরোধী শিবিরে যোগ দিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ আরও কট্টর উগ্র ইহুদিপন্থি দলগুলোর দিকে ঝুঁকছেন।

নেতানিয়াহুবিরোধী জোট এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো একক নেতাকে মনোনীত করেনি। তবে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় দেখা যাচ্ছে।

মিচেল বারাকের মতে, নেতানিয়াহুর সামনে আপাতত কোনো একক প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। তাকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে একাধিক বিরোধী দলের সম্মিলিত শক্তিকে।

আয়দা তুমা-স্লিমান ইসরাইলের নির্বাচনি রাজনীতিতে দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ তুলেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গাজা যুদ্ধ নিয়ে মন্তব্যের কারণে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে।

অথচ ফিলিস্তিনিদের অধিকার সীমিত করার মতো নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ সত্ত্বেও নেতানিয়াহু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বলে অভিযোগ তুমা-স্লিমানের।

তিনি আরও বলেন, আরব পার্লামেন্ট সদস্য সামি আবু শাহাদেহকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগের মুখে থাকা নেতানিয়াহু প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

ফ্লাশেনবার্গের বিশ্লেষণে, নেতানিয়াহুর সমর্থকদের কাছে তিনিই এখনো ইসরাইলের নেতৃত্ব দেওয়ার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। বিপরীতে, বিরোধীদের চোখে তিনি দুর্নীতির প্রতীক এবং ৭ অক্টোবরের আগের ও পরের পরিস্থিতির জন্য দায়ী একজন নেতা।

নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কী?

নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকাই হয়তো তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নয়। বরং তার বিরোধীরাও যে উগ্র ইহুদি জাতীয়তাবাদ, সামরিক শক্তিনির্ভর নীতি এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের রাজনৈতিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না, সেটিই বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।

এ প্রসঙ্গে ফ্লাশেনবার্গ যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, থ্যাচার একসময় বিরোধী রাজনীতিকে নিজের আদর্শিক অবস্থানের দিকে নিয়ে আসাকে নিজের বড় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

ফ্লাশেনবার্গের মতে, নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তার বিরোধী শিবিরের শীর্ষ নেতারাও উগ্র ইহুদি জাতীয়তাবাদ ও সামরিক শক্তিনির্ভর রাজনীতির কাঠামোর মধ্যেই অবস্থান করছেন।

সব মিলিয়ে, ইসরাইলের রাজনীতিতে উগ্রপন্থার বিস্তার ঘটানো এবং বিরোধীদেরও সেই রাজনৈতিক ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখাই নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হয়ে উঠতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *