নারীর ক্ষমতায়ন, আর্থিক স্বনির্ভরতা, শিক্ষা এবং নেতৃত্বের বিকাশে সমান সুযোগ সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি বলেছেন, নারীর অগ্রগতি কেবল কতজন নারী উচ্চপর্যায়ের পদে আসীন হয়েছেন, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং তাদের পথ অনুসরণ করে আরও কতজন নারী সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের নারীদের জন্য নেতৃত্বের পথ কতটা সহজ হচ্ছে, সেটিই প্রকৃত অগ্রগতির মাপকাঠি।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অনুষ্ঠিত ওম্যান লিডারশিপ সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ৩০তম ইউএস ট্রেড শোর অংশ হিসেবে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) এবং ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ নারী হলেও বাল্যবিয়ে, শিক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতির কারণে তাদের বড় একটি অংশ এখনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল স্রোতে যুক্ত হতে পারছেন না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের হার ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ। বিপরীতে পুরুষের ক্ষেত্রে এ হার ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ। এ ছাড়া দেশের ৯০ হাজার ৪৯টি গ্রামের কোটি কোটি নারীও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যাশিতভাবে অংশ নিতে পারছেন না।
শিক্ষাক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিকে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ ছাত্রী ঝরে পড়ছে। উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণের হার মাত্র ২০ দশমিক ৮ শতাংশ। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা এবং কর্মসংস্থান পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু সনদ অর্জন নয়, সাক্ষরতা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ব্যবহারিক দক্ষতা, উদ্ভাবন ও নেতৃত্বের বিকাশেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করেছিলেন। দেশজুড়ে চালু হওয়া ‘নতুন কুঁড়ি’ ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতাও শিশুদের, বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজ, শৃঙ্খলা, জবাবদিহি, সহমর্মিতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
নারীর আর্থিক স্বাবলম্বিতার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে জুবাইদা রহমান বলেন, নিজের আয়, সঞ্চয় এবং আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবারের সামগ্রিক সক্ষমতাকেও শক্তিশালী করে। এ লক্ষ্য অর্জনে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে কাজ করবে। স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে প্রায় এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যার ৮০ শতাংশই নারী। একই সঙ্গে ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নারীদের কর্মজীবন ও পেশাগত অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে দেশব্যাপী দিবাযত্ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, পারিবারিক দায়িত্ব যেন নারীদের কর্মজীবন ও ক্যারিয়ার গঠনের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নতুন দক্ষতা অর্জন এবং দীর্ঘ বিরতির পর আবার পেশায় ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করাও জরুরি।
প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল সেবা এবং আধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে দেশের অর্থনীতি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উদ্ভাবননির্ভর হয়ে উঠবে। নারীর অগ্রগতি নিশ্চিত করতে সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু নারীদের সাফল্য উদযাপন করলেই হবে না, তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বিদ্যমান বাধাগুলোও দূর করতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আকাঙ্ক্ষাকে সুযোগে, সুযোগকে নেতৃত্বে এবং নেতৃত্বকে দেশের টেকসই উন্নয়নে রূপ দেওয়া সম্ভব।
অনুষ্ঠানে মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার জাকিয়া সুলতানা সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন। এ ছাড়া আলোচকদের মধ্যে ছিলেন এফআইসিসিআই সভাপতি রুপালী হক চৌধুরী, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ, ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের অ্যাক্টিং ডেপুটি চিফ অব মিশন তৃশিতা মোওলা, শেভরন বাংলাদেশের সভাপতি ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শু শিয়ং এবং ওরাকলের বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের কান্ট্রি ম্যানেজিং ডিরেক্টর রুবাবা দৌলা।
সেমিনার আয়োজনের জন্য অ্যামচেম ও মার্কিন দূতাবাসের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ডা. জুবাইদা রহমান। একই সঙ্গে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও প্যানেল আলোচকদেরও ধন্যবাদ জানান তিনি।
