জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানান। একই পোস্টে দল ত্যাগের পেছনের কারণ এবং এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নিজের অসন্তোষ ও আপত্তির বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী সামান্তা শারমিন এর আগে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
গত ২৩ অক্টোবর ঘোষিত দলের নতুন কমিটিতে তাকে শুধু যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে নতুন কমিটিতে তার পদমর্যাদা কমানো হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সামান্তা শারমিন বলেন, প্রায় এক বছর আগে এনসিপির জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিলেন। সে সময় তার বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নীতিগত কিংবা কৌশলগত কোনো দিক থেকেই এনসিপির মিত্র হওয়ার উপযুক্ত নয়। দলটির সঙ্গে জোট করলে এনসিপিকে বড় ধরনের রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে বলেও সতর্ক করেছিলেন তিনি।
তিনি আরও জানান, গত ১১ মাস ধরে নিজের রাজনৈতিক উপলব্ধি থেকে এনসিপির অতীত কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ, প্রস্তাব ও মতামত দিয়েছেন। সুযোগ পেলেই আলোচনা, বিতর্ক ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন।
দলের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে সামান্তা শারমিন বলেন, প্রায় এক বছরের এই প্রচেষ্টার এখানেই সমাপ্তি টানছেন তিনি। তার মতে, এনসিপির পক্ষে দল প্রতিষ্ঠার সময়কার মূল্যবোধের প্রতি আর আন্তরিক থাকা সম্ভব হচ্ছে না।
জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিরোধিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রকৃত অর্থে সংস্কারভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। দলটির দার্শনিক ভিত্তি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রস্তাবিত কাঠামো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সামান্তা শারমিনের ভাষ্য, এনসিপি যখন জামায়াতকে সংস্কারের পথে সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করেছে, তখন উদার ও গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন সাধারণ মানুষ সংস্কারের রাজনীতি থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
২০২৬ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরে তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশন, নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের ব্যর্থতার পরও এনসিপির সামনে বিকল্প পথ খোলা ছিল। পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া দলগুলোর সঙ্গে জোট করা অথবা এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল। তার মতে, এমন সিদ্ধান্ত নিলে বর্তমান ফলাফলের চেয়ে ভালো ফল অর্জন করতে পারত দলটি।
তবে এনসিপি সেই সম্ভাবনা কাজে না লাগিয়ে একটি বড় রাজনৈতিক দলের অনুসারী হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এতে দলটির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় এবং গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন ধারার রাজনীতির সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন সামান্তা শারমিন।
গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অবদান ও অধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এনসিপি নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে ধারণ করতে পারেনি। বরং দলটির ভূমিকা নারীবিরোধী রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে মিলে গেছে। এর ফলে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তার অভিযোগ, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের এগিয়ে আসার যে সুযোগ গণঅভ্যুত্থান তৈরি করেছিল, এনসিপি তা কাজে লাগাতে চায়নি। পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মতোই নারীদের কোণঠাসা করা হয়েছে, তাদের প্রতিবাদকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি এবং পুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
দলের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সামান্তা শারমিন। তিনি বলেন, কাউন্সিল আয়োজন না করে পুনরায় আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন দলের ভেতরের গণতান্ত্রিক চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তার মতে, পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মতোই বিরোধী মত দমনের প্রবণতা অনুসরণ করছে এনসিপি।
নিজের রাজনৈতিক দর্শন তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে বর্তমানে নানা বিভাজনের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। অথচ গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল এমন একটি রাজনৈতিক স্বপ্ন ও সম্ভাবনা তৈরি করা, যা মানুষকে বিভক্ত না করে ভিন্নমত, বিশ্বাস ও পরিচয়ের মানুষকে একটি অভিন্ন জাতীয় আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করবে।
ফেসবুক পোস্টের শেষাংশে সামান্তা শারমিন জানান, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার এই উদ্যোগে তিনি কাজ করে যেতে অঙ্গীকারবদ্ধ। এ বিষয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করতে আগ্রহীদের তার সঙ্গে যোগাযোগের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সবাইকে সঙ্গে নিয়েই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টা এগিয়ে নিতে চান তিনি।
