বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের নেপথ্যে যাঁরা নিঃশব্দে অবদান রেখে গেছেন, তাঁদের মধ্যে আব্দুল আওয়াল মিন্টু একটি উল্লেখযোগ্য নাম। উন্নত ও মানসম্মত বীজের মাধ্যমে কৃষকদের ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা কমানোর যে প্রয়াস, তার অগ্রদূতদের একজন তিনি।
নব্বইয়ের দশকে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদের আহ্বানে নেদারল্যান্ডসের খ্যাতনামা কৃষি বিজ্ঞানী সাইমন গ্রুট বাংলাদেশ সফরে আসেন। ঢাকার একটি হোটেলে আলোচনাকালে তিনি দেশের কৃষি বাস্তবতা নিয়ে স্পষ্ট ভাষায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। রোগপ্রতিরোধী ও উন্নত জাতের বীজের সংকট, ভুল বীজ ব্যবহারে ফসলহানি, অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের খরচে কৃষকের ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে তিনি মন্তব্য করেন—এই ব্যবস্থা কৃষকদের এক ধরনের আধুনিক দাসত্বে আবদ্ধ করে রেখেছে।
এই কথাগুলো গভীরভাবে প্রভাব ফেলে তখনকার শিল্পপতি ও রাজনীতিবিদ আব্দুল আওয়াল মিন্টুর ওপর। তিনি উপলব্ধি করেন, কৃষির মূল সমস্যার সমাধান না হলে কৃষকের জীবনমান বদলানো সম্ভব নয়। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি জাপান থেকে উন্নত জাতের বীজ এনে দেশে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করেন। ফলাফল ইতিবাচক হওয়ায় ১৯৯৫ সালে তিনি বীজ উৎপাদন ও গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘লাল তীর’ প্রতিষ্ঠা করেন।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে লাল তীর দেশের বীজ বাজারে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করে। শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ছিল—সাধারণ কৃষকের হাতের নাগালে মানসম্মত বীজ পৌঁছে দেওয়া। নিজস্ব গবেষণাগার স্থাপন, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গবেষণা দল গঠন এবং মাঠপর্যায়ে বিনামূল্যে বীজ ও উপকরণ সরবরাহ করে পরীক্ষামূলক চাষ—সব উদ্যোগই নেওয়া হয়েছে কৃষকের বাস্তব চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লাল তীরের গবেষণা প্লট গড়ে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি গবাদিপশুর উৎপাদন বাড়াতে উন্নত গরু ও মহিষের সিমেন নিয়েও গবেষণা চলছে। উপকূলীয় এলাকার জন্য লবণাক্ততা সহনশীল ফসল উদ্ভাবনে বাগেরহাটের রামপালে স্থাপিত গবেষণা কেন্দ্র বিশেষ ভূমিকা রাখছে। উজানের বাঁধ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে জমিগুলো ক্রমে লবণাক্ত হয়ে পড়ছে, সেগুলোকে আবার চাষের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে এসব গবেষণার মাধ্যমে।
যেখানে অনেক প্রতিষ্ঠান দ্রুত মুনাফার খোঁজে বিনিয়োগ করে, সেখানে আব্দুল আওয়াল মিন্টু বেছে নিয়েছেন দীর্ঘমেয়াদি ও ঝুঁকিপূর্ণ হলেও কৃষকের জন্য উপকারী পথ। এর ফলেই গ্রামবাংলায় ‘লাল তীর’ আজ ন্যায্য দামে বিশ্বাসযোগ্য বীজের প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছে। কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বীজ বপনের পর চারা না ওঠা বা ভিন্ন ফসল পাওয়ার আশঙ্কা এখন অনেকটাই কম।
টেক্সটাইল, রডসহ নানা খাতে সফল ব্যবসায়ী হওয়া সত্ত্বেও নিশ্চিত লাভের পথ ছেড়ে কৃষিখাতে বিনিয়োগ তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। যাঁরা তাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, তাঁদের মতে তিনি প্রচারবিমুখ, মার্জিত ও বিনয়ী মানুষ।
মাঠের কৃষকদের চোখে আব্দুল আওয়াল মিন্টু এখন কেবল একজন উদ্যোক্তা নন—তিনি কৃষির প্রতি নীরব দায়বদ্ধতার এক জীবন্ত উদাহরণ।
সূত্রঃ কালবেলা
