ভারতে স্যাটেলাইটনির্ভর ইন্টারনেট সেবা চালুর প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় দেশটির প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক। তাঁর অভিযোগ, নিজেদের বাজারের আধিপত্য ধরে রাখতে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী স্টারলিংকের প্রবেশের পথে বাধা তৈরি করছেন।
মাস্ক তাঁর বক্তব্যে সরাসরি কারও নাম উল্লেখ না করলেও বিষয়টি ঘিরে ভারতের শীর্ষ দুই টেলিযোগাযোগ ব্যবসায়ী মুকেশ আম্বানি ও সুনীল ভারতী মিত্তলকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে তাঁদের কাউকে সরাসরি স্টারলিংকের প্রবেশে বাধা দেওয়ার জন্য দায়ী করার মতো নিশ্চিত তথ্য সামনে আসেনি।
কেন আলোচনায় মুকেশ আম্বানি?
ভারতের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও তরঙ্গ বরাদ্দের পদ্ধতি নিয়ে কয়েক বছর ধরেই মতবিরোধ রয়েছে। ২০২৪ সালে রিলায়েন্স জিওর মালিক মুকেশ আম্বানি এবং ভারতী এয়ারটেলের চেয়ারম্যান সুনীল ভারতী মিত্তল স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের তরঙ্গ নিলামের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেন।
অন্যদিকে, ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্টারলিংক প্রশাসনিক পদ্ধতিতে তরঙ্গ বরাদ্দের পক্ষে ছিল। এই মতপার্থক্যের কেন্দ্রে রয়েছে স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের বাজারে প্রতিযোগিতার নিয়ম এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রশ্ন।
আম্বানি ও মিত্তলের অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হলেও মাস্কের সাম্প্রতিক বক্তব্যে তাঁদের কারও নাম সরাসরি উঠে আসেনি। ফলে স্টারলিংকের প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগটি তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
লাইসেন্স পেয়েও কেন চালু হচ্ছে না স্টারলিংক?
ভারতে ব্যবসা শুরুর লক্ষ্যে স্টারলিংক দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় অনুমোদন সংগ্রহ করছে। ২০২৫ সালের জুনে প্রতিষ্ঠানটি ভারতের টেলিযোগাযোগ বিভাগ থেকে লাইসেন্স পায়। একই বছরের জুলাইয়ে মহাকাশ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনও পায় তারা।
তবে লাইসেন্স পাওয়ার পরও বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বাকি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চূড়ান্ত নিরাপত্তা ছাড়পত্র, তরঙ্গ বরাদ্দ এবং বিদেশি বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় অনুমোদন।
স্টারলিংকের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ভাইস প্রেসিডেন্ট লরেন ড্রেয়ার সম্প্রতি জানিয়েছেন, ভারতে প্রতিষ্ঠানটির ২০টি গ্রাউন্ড গেটওয়ে স্থাপন করা হয়েছে। এসব স্থাপনায় রয়েছে শত শত অ্যানটেনা। সরকারি অনুমোদন পাওয়া গেলে সেবা চালু করতে প্রতিষ্ঠানটি প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন তিনি।
অনুমোদনে বৈষম্যের অভিযোগ নাকচ ভারতের
মাস্কের মন্তব্যের পর ভারতের যোগাযোগ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্যাটেলাইট যোগাযোগসহ টেলিযোগাযোগ খাতের বিভিন্ন সেবার অনুমোদনে সরকার ন্যায্য ও বৈষম্যহীন নীতিমালা অনুসরণ করছে।
মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট তিনটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা যাচাই চলছে এবং অনুমোদনপ্রক্রিয়ায় তারা মোটামুটি একই পর্যায়ে রয়েছে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে কিংবা অন্য প্রতিষ্ঠানকে ইচ্ছাকৃতভাবে পিছিয়ে রাখা হচ্ছে—এমন অভিযোগকে সরকার ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
সরকারের এই অবস্থানের বিপরীতে মাস্কের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, স্টারলিংকের সেবা চালুতে বিলম্বের পেছনে নিয়ন্ত্রক জটিলতা কতটা দায়ী, আর বাজারের বিদ্যমান প্রতিযোগিতার প্রভাবই বা কতটুকু।
স্টারলিংক ও ভারতীয় টেলিকম প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক
ভারতে স্টারলিংকের প্রবেশ নিয়ে প্রতিযোগিতার বিতর্ক থাকলেও স্পেসএক্সের সঙ্গে দেশটির বড় টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক যোগাযোগও রয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে রিলায়েন্স জিও ও ভারতী এয়ারটেল—দুটি প্রতিষ্ঠানই স্পেসএক্সের সঙ্গে পৃথক চুক্তি করে। সরকারি অনুমোদন সাপেক্ষে ভারতে স্টারলিংকের সরঞ্জাম বিতরণের সুযোগ তৈরিই ছিল এসব চুক্তির উদ্দেশ্য।
এ কারণে বিষয়টিকে শুধু মাস্ক ও আম্বানির ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখার চেয়ে ভারতের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বাজারের নীতিমালা, ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখা জরুরি।
শেষ পর্যন্ত কী হবে স্টারলিংকের ভারতে প্রবেশের?
ভারতে স্টারলিংকের সেবা চালু নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে অনুমোদনপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি, তরঙ্গ বরাদ্দের নিয়ম এবং বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ। মাস্ক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললেও ভারত সরকার বলছে, সব প্রতিষ্ঠানের জন্য একই ধরনের নিয়ন্ত্রক কাঠামো অনুসরণ করা হচ্ছে।
চূড়ান্ত নিরাপত্তা ছাড়পত্র ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ভারতে স্টারলিংকের বাণিজ্যিক সেবা চালুর সময়সূচি নিশ্চিত নয়। এখন দেখার বিষয়, বাকি প্রক্রিয়াগুলো কত দ্রুত শেষ হয় এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ টেলিযোগাযোগ বাজারে স্টারলিংক শেষ পর্যন্ত কীভাবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে।
সূত্র: রয়টার্স, দ্য প্রিন্ট ও বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।
